চেষ্টা…

আমাদের বিজয়ের মাস চলে গেলো, আমরা অনেক ভাবেই নিজের দেশপ্রেম প্রকাশ করেছি। যেমন আমরা অনেকে বাসার সামনে জাতীয় পতাকা উড়িয়েছি, গাড়িতে লাগিয়েছি। অনেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন ফেসবুক, মিগ৩৩, টুইটার, ইত্যাদিতে দেশপ্রেম মুলক বিবৃতিও দেওয়া শেষ । বিশেষ করে  ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জের ধুম পড়ে গিয়েছিল। আমরা নিজের প্রিয় প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে তার চেয়ে প্রিয় নিজের দেশের পতাকা প্রোফাইল পিকচার দিয়ে নিজেকে ধন্য করেছি এবং নিজের  দেশপ্রেমের সত্ত্বাকে প্রকাশ করেছি। কিন্তু এতেই কি শেষ, আমাদের তিরিশ লক্ষ শহীদ আমাদের কাছে এটাই চেয়েছেন??

স্বাধীনতার ৪১ বছর পার হয়ে গেলো আমাদের দেশ এখনও কোথায় দাড়িয়ে আছে, একটু ভাবলেই দেখতে পারবো, আমাদের চেয়ে কিছু সময় আগে স্বাধীন হওয়া দেশ মালয়শিয়া তার দেশের সন্তানদের নিয়ে উন্নয়নের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে, কিন্তু আমরা কোথায়, তার একটা উদাহরন দেই, আমি যখন ক্লাস ৯ মানে ২০০৭ সাল, আমি কম্পিউটার শিক্ষা নিয়েছিলাম আমার অতিরিক্ত বিষয়, কিন্তু আমাদের স্কুলের কম্পিউটার ল্যাবে গিয়ে দেখলাম মাত্র ৬ টা কম্পিউটার ১ টা আমাদের টিচার নিজের মনে করে ব্যাবহার করে,২টা ছিল নষ্ট অন্য ৩ টি ছিলো ২৮ জন স্টুডেন্টের জন্য, কিন্তু সেগুলোতে চলত উইন্ডোজ ৯৮,অফিস প্রোগ্রাম ব্যাবহার করা হত অফিস ৯৮, এমনকি বইও ছিলও উইন্ডোজ ৯৮ ভিত্তিক, কিন্তু তখন উইন্ডোজ এক্সপি যায় যায় অবস্থা, একটা সরকারি স্কুলের অবস্থা এটি, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পাকিস্তানে শিশুকাল থেকে কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন অবস্থা কেনও, শুনতাম আমাদের স্কুলে প্রতি বছর ৪ টা করে কম্পিউটার আসতো, ২ টা যেতো ২ শিফটের দুই জন শিক্ষকের কাছে, ১টা নিতো প্রধান শিক্ষক, আর একটা ঢুকতো ল্যাবে বেসরকারি স্কুলেতো আরও বাজে অবস্থা, বর্তমানে যে অবস্থা ভালো, তা কিন্তু নয় ।

বাংলাদেশের দুর্নীতির বর্তমান রানার্সআপ হলো শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্নীতির মুল কারখানা হলো প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো, একটু চিন্তা দেখেন একটা ক্লাস ৪এর একটা স্টুডেন্ট যদি বলে, ‘x’ ম্যাডামের কাছে পড়ব, ম্যাডামের কাছে পড়লে ম্যাডাম বেশি নাম্বার দিবে, এইটুকু বাচ্চা কি শিখলো,শিখলো দুর্নীতি। এটতো গেলো ছোটদের কথা,

হাই-স্কুলের কথাই ধরি, আমি আমাদের ক্লাস টিচার আমাকে বাসায় এসে গণিত এবং রসায়ন পড়াত । উনি পরীক্ষার আগে এসে যেসব অংকগুলো করাত, ঠিক ওইসব অংকগুলোই পরীক্ষায় এসে হাজির, একটা ও মিস নেই, রসায়নে যেসব প্রশ্ন বইতে দাগিয়ে দিতো। একটা দুটি ছাড়া সব কমন, তখন চিন্তা করতাম স্যার কতো ভালো, কিন্তু এখন বুজছি স্যার ভালো ছিল না, স্যার আমার আব্বুর দেওয়া মাসে মাসে ৪,০০০৳ টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যেতেন,

কলেজেতো এর অবস্থা আরও প্রকট, আমাদের কলেজের পদার্থ শিক্ষকের নিজের মুখের কথা, “প্রেকটিকাল পরীক্ষা সম্পূর্ণ ভাগ্যের উপর, আর আমার সাথে যাদের যোগাযোগ আছে তারা ভালো করবে, ইনশাল্লাহ। আর যাদের যোগাযোগ নেই তাদের দায়িত্ব আমি নিতে পারবো না। উনি আল্লাহের নাম বলে দুর্নীতি করতো, এটা যে দুর্নীতি তিনি মনে হয় বলতে পারবেন না।

টিআইবি,র ভাষ্যমতে বাংলাদেশের ৭৮% দুর্নীতি করে শিক্ষিতরা, এই শিক্ষিতরা হয়ত কারো কাছ থেকে শিখে এসেছে, এটাই বাস্তবতা, টিভির বিজ্ঞাপনটার মত, “ওর কি দোষ, আশেপাশে যা দেখছে তাই তো শিখবে.

অনেকে বলবেন যে, মানুষের মন-মানুষিকটার একটা ব্যাপার আছে, কিন্তু একটা বাচ্চা যখন শিশুকাল থেকেই দুর্নীতি শিখে থাকে, তো আমরা তার কাছে কোন রকম সুনীতি আসা করবো।’
দেশের জন্য আরেকটা হুমকি হলো, আমাদের বিদেশী পণ্য ব্যাবহারের মানসিকতা। যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয় কেনও ব্যাবহার করেন বিদেশী পণ্য, ১০% বলবেন বিলাসিতা করছি, ৮০% বলবেন ভালো আর ২০% কেনও ব্যাবহার করেন তার কারন তিনি জানেন না ।
আল্লাহ যদি বাংলাদেশের সব মানুষকে অবস্থাসম্পরন্ন করতেন তাহলে সব দেশি কোম্পানিকে পথে বসতে হত ।ইতিহাস থেকে জানা যায় বাঙলালিদের এই বিদেশী জিনিসের প্রতি আকর্ষণ ধর্ম আমাদের দেশে আসছে সেই পর্তুগীজ আমল থেকে, তখন থেকে বংশের ধারাবাহিকতায় এখনও বয়ে চলছে এই ধর্মটা, কিন্তু আগে তো বিদেশী জিনিসের সমতুল্য তেমন কোন পণ্য ছিলো না, কিন্তু এখন তো একটা না, অনেক গুলোই আছে, আমার খুব খারাপ লাগে, যখন বাংলাদেশের পণ্যের উপর আমাদের কোনো বিশ্বাসই থাকে না, শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস আনতে গ্যারান্টি কার্ড দিতে বাধ্য হয়েছে ।

তাতো বাদ দিলাম, অনেকের ক্ষেত্রে দেখলাম তারমাঝে একজন আমি নিজেই বিদেশী ব্রান্ডের দেশি ভার্শনের উপরও বিশ্বাস রাখতে পারি না। আমারা অনেক সময় ফেয়ার & লাভলী এর বাংলাদেশীটা না কিনে দিগুন বা তিনগুন দাম দিয়ে ইন্ডিয়া বা থাইল্যান্ডেরটা কিনি, কিন্তু কেন?? এগুলা তো আমাদের জন্য বানায়নি, বা অইদেশের আবহাওয়ার সাথে আমাদের কোন মিল আছে, একটা গবেষনায় দেখা গেছে, ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের ফেয়ার & লাভলী ক্রিমের মধ্যে pH ব্যবধান 0.75, এবং অনেক কেমিক্যাল গড়মিল । যা বাঙ্গালিদের ত্বকের জন্য ক্ষতিকর ।

আমরা জানি বাংলাদেশী সাবানগুলো তৈরি হয় ভেজিটেবল অয়েল দিয়ে তৈরি, কিন্তু আমাদের দেশের সবচেয়ে ব্যবহৃত সাবান তৈরি হয়, সাইবেরিয়া থেকে আমদানি করা শুয়োরের চর্বি থেকে (সুত্র:nat geo তে প্রচারিত প্রতিবেদন)। এটা প্রতিবেদনটা দেখার আগে আমি এটা জানতাম না, কিন্তু আমি জানি একথা অনেকেই জানতেন। কিন্তু একথা আমিও জানি আপনিও জানেন শুয়োরের চর্বি আমাদের ধর্মে হারাম ।

বাংলাদেশের মিডিয়া দখল করে আছে বিদেশী প্রধানত ভারতীয় টিভি চ্যানেল ও চলচিত্র। এমন দখলের পরেও আমার গর্বে বুক ভরে উঠে যখন শুনি আমাদের দেশের দর্শকরা ভারতের রোবট ও রা-ওয়ান এর মত হাই-বাজেটের মুভিকে কার্টুন ছবির সাথে তুলনা করে।

শেষ করবো আমাদের সবচেয়ে আপন বস্তুর কথা বলে, সেটা হল মোবাইল অপারেটর নিয়ে, আমরা তো প্রোফাইল পিকচার পালটিয়ে নিজেদের অনেক দেশপ্রেমিক মনে করি, কিন্তু নিজের দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করছে, কিন্তু আমরা দেশের সম্পদ রক্ষার জন্য নিজের দেশের মোবাইল অপেরেটর “teletalk” ব্যাবহার করতে পারি না। অনেকে যুক্তি দেখাবেন, টেলিটকএর সার্ভিস ভালো না, তিরিশ লক্ষ মানুষ দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন কিন্তু দেশের জন্য এটুকু সেক্রিফাইজ করতে পারবো না, কিভাবে নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবি করি আমরা।

আমারা শুধু ইচ্ছা না করে যদি একটু চেষ্টা করি তাহলে আমরা দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো…।।

Posted on জানুয়ারি 5, 2012, in Uncategorized. Bookmark the permalink. ১ টি মন্তব্য.

  1. ho apner chinta chetona valo kinto ai deshe kon sector ar opor bishas rakben ? sombob na jekhane sorker e sobchaite dornite baj & ai pottake aro sogum kore.

অনুগ্রহ করে মন্তব্য দিন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s