শক্তি-পানীয় ও আত্মহত্যা

ছোটবেলা থেকে একটা বিষয়ে আমার কনফিউশন ছিল, এবং সেটা এখনও বিদ্যমান । আমি যখন একটা লোহাকে দিয়ে বলি যদি এটা কোমল ও নরম কেউ যেমন টা বিশ্বাস করবেন না, তেমনি কেউ যদি কোকাকোলাকে কোমল পানীয় বলে যদি গলা ফাটিয়ে ফেলেন তবুও আমি বিশ্বাস করতে পারবো না যে এটি আদৌ কোমল কিনা । কেননা এই কোকাকোলা খেয়ে কখনও আমার কোমল মনে হয় নি, কারন মানুষ কোন বৈশিষ্ট্যের কারনে এই পানীয় গুলোকে কোমল বলে তাই এখনও আমার বোধগম্য না।
আবার ইদানিং কোমল পানীয়ের জায়গাটাতে মোটামুটি নেড়েচড়ে বসেছে এনার্জি ড্রিঙ্কস নামে আর একটা তথাকথিত কোমল পানীয়। মনে পড়ে ছোটবেলায় সার্ক এনার্জি ড্রিঙ্কসের বিজ্ঞাপন দেখে অনেকদিন বায়নার পর আম্মু ৩৫ টাকা দিয়ে একটা কিনে দিয়ে ছিল, কিনে আনার পরে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে শুধু খাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, কেমন জানি হবে, কেমন জানি শক্তি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি…
 কিন্তু প্রথম চুমুক দেওয়ার পরে শক্তি হওয়া তো দুরের কথা, সারাদিন যা কিছু খেলাম সব বমি আকারে বের হয়ে গেলো, এর পর থেকে  ৭ বছর এই কোমল জিনিস টা খাওয়ার চেষ্টা করি নাই।

 আমি না খেলে কি হয়েছে, এই শক্তি পানীয় তো বসে নেই। এক ব্র্যান্ড থেকে হল প্রায় দশটার উপর ব্র্যান্ড,তার উপর আছে বিদেশী গুলো। এই শক্তি পানীয় গুলো খেয়ে কেউ ক্যারামের আঘাতে স্মৃতি ফিরে পায়, কেউ আবার বোলিং করলে তাতে আগুন ঝরে, আবার কেউ বিড়াল ধরে এমন অনেক যুক্তিহীন বিজ্ঞাপনও টিভিতে শোভা পায়। অবাক হবেন বাংলাদেশে এখন প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বাজার আছে এই শক্তি পানীয়ের । বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অনেকগুলোতে বিএসটিআই এর সিল নাই। বিশ্বাস না হলে আপনারা নিজেরাই দেখে নিবেন। বাজারে সয়লাব হওয়া এসব এনার্জি ড্রিংকস পান করলে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃতি হতে পারে। হঠাৎ করে শক্তি পাওয়া যাবে ভেবে, অনেক শিশু, কিশোর এতে আকৃষ্ট হচ্ছে। আমাদের দেশে যখন একের পর এক শক্তি পানীয় প্রবেশ করছে, ঠিক তখনি উন্নত বিশ্বে একের পর এক শক্তি পানীয় নিষিদ্ধ করছে। সম্প্রতি ক্ষতিকর উপাদান থাকার কারনে “লাল ষাঁড়”(red bull) নামক শক্তি পানীয়টি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক ভাবে এটি বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করেছে, কিন্তু এতে আফিম মিশ্রিত হয় বলে প্রমাণ আছে । কিন্তু এটি এখন দেশের ছোটঘাট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও কনফেক-শনারিগুলোতে শোভা পাচ্ছে।

 

আমাদের দেশে এনার্জি ড্রিংকসের প্রতি তরুণ সমাজের অতিমাত্রায় আগ্রহ ও বিএসটিআই ল্যাবরেটরি রিপোর্ট প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. গোলাম রাব্বানি বলেন,কথিত এসব এনার্জি ড্রিংকস-এ অ্যালকোহলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে অতিমাত্রায়। মূলত এসবের হাত ধরেই নেশার জগতে প্রবেশ করছে তরুণরা। এছাড়া এনার্জি ড্রিংকস-এ রয়েছে ক্যাফেইন। আর এ ক্যাফেইন নিয়মিত গ্রহণ করলে দীর্ঘ-মেয়াদে মানব দেহের ক্ষতি করে।
কিছুদিন আগে ক্লাস ৯ এর একটা শিক্ষার্থীকে এনার্জি ড্রিঙ্ক কেনও খায়, এই প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করলে তার উত্তরটা ছিল এমন, “আমার দিনে ৩ টা এনার্জি ড্রিঙ্ক ছাড়া চলেই না, দুইটা খওয়ার পর যখন তিনটা খাওয়ার যে কি মজা, না খেলে বুঝা যাবে না”।

 

কি কি আছে এই শক্তি পানীয়তে আসুন একটু চোখ বুলিয়ে নেই, মৃগী রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী ক্যাফেইন এই শক্তি পানীয়র অন্যতম প্রধান উপাদান, একটা স্বাভাবিক মানুষের দেহে ৩০০-৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন যথেষ্ঠ। কিন্তু একটা এনার্জি ড্রিঙ্কসে ক্যাফেইনের পরিমাণ ৩৬০ মিলিগ্রাম। কিন্তু প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো বলে থাকে ক্যাফেইন স্বাদ বাড়ানোর জন্য মিশ্রিত করা হয়ে থাকে, কিন্তু ক্যাফেইনের স্বাদ হল তিতা, তিতার কারনে কি রকম স্বাদ বৃদ্ধি হয়, তাও আমার বোধগম্য নয়, কিন্তু পরে জানতে পারলাম এটি অন্যান্য উপাদানের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, এবং আসক্তি বৃদ্ধি করে, চিকিৎসকের মতে,এসব ক্ষতিকর ও নেশাজাতীয় উপাদান মেশানো এক বা দুই বোতল সফট ড্রিংকসই অনিদ্রা, নার্ভাসনেস ও দ্রুত হৃৎস্পন্দন সৃষ্টির জন্যে যথেষ্ট। বেশি পরিমাণে খেলে তা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন থেকে শুরু করে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ প্রবণতা, পেশিতে টান লাগা, অসংলগ্ন কথাবার্তা , বিষণ্নতা এবং উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে। আর ক্যাফেইনের অন্য একটা ক্ষতিকর দিক হল, এটি প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়ায় এবং দেহকে পানিশূন্য করে ফেলে। আর যেহেতু এটি কার্বনে-টেড ড্রিঙ্কস তাই এর কার্বন-ডাই-অক্সাইড দেহের পানির সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন মনোক্সাইড তৈরি করে যা শ্বাসকষ্টের জন্য দায়ী। অন্যদিকে অন্যান্য সফটড্রিঙ্কস এর মত এনার্জি-ড্রিঙ্কসেও পলি-ইথিলিন গ্লাইকোল আছে, যা ক্যানসারের জন্য দায়ী। আর এই পানীয় গুলোর লেভেলে ফস-ফরিক এসিড একটা উপাদান আছে খেয়াল করবেন, এটি আপনার সুন্দর দাঁত গুলোকে হলুদ করতে একাই একশ। আর এই ফস-ফরিক এসিড আপনার শরীরের ক্যালসিয়ামকে ক্ষয় করে থাকে । তাই তো এই বয়সে আমাদের কিছুর সাথে ধাক্কা লাগলেই হাড় ভেঙ্গে যায়, এবং সেই ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগতে আগের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগে। সবই এই সফট ড্রিঙ্কস খাওয়ার ফসল।

এতো গুলো খারাপ জানার পরও কি আমার এই কোমল* পানীয় পান করবো । আমার মনে হয় কেউ খাবেন না। আর যদি কারো খেয়ে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে তাকে বুঝানো আর লোহাকে কোমল প্রমাণ করানো একই কথা।

Posted on জানুয়ারি 6, 2012, in Uncategorized. Bookmark the permalink. 2 টি মন্তব্য.

  1. তথ্যমূলক পোস্টে প্লাস দিয়ে গেলাম। ব্লগাতে থাকুন। :)

  2. go ahead

অনুগ্রহ করে মন্তব্য দিন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s