“ZANNAT-DOKHT তারকা কথন”
ছোটবেলায় খুশির সময়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটা সময় ছিল, রাতের বেলায় কারেন্ট চলে যাওয়া। কি যে খুশি লাগতো তখন, পড়াশুনা বন্ধ। সবাই বাড়ির উঠানে খেলতে বের হয়ে যেতো । একবার মনে পড়ে আমাদের দাদু আমাদের সবাইকে নিয়ে তারা দেখাতো। তারা আবার দেখার কি? তারাতো তারাই, কিন্তু তারার মধ্যে যে কত কিছু লুকিয়ে আছে, তখন বুজতাম না। দাদু তখন তারাগুলো দিয়ে আঁকা আকাশের মধ্যে বিভিন্ন ছবি দেখাতো, উনি বলত আমি কিছু না বুঝেই তাকিয়ে থাকতাম। আকাশের মধ্যে নাকি গরু, ছাগল, ভেড়া, মানুষ, সাপ ইত্যাদি অনেক কিছুরই ছবি আঁকা থাকতো। আগের দিনের মানুষ নাকি তারা মিলাতে গিয়ে দেখতে পেল তাদের গৃহপালিত পশুদের, অনেকে তার প্রিয় মানুষটাকে দেখতে পায়, আবার অনেকে তাদের বন্ধুদের কেও নাকি দেখত পেতো। কিন্তু কখন কিভাবে যে এমন ছবি আকার খেলা শুরু হয়েছিল কেউ জানে না।
এমন হতে পারে, কেউ একজন তারাদের নিয়ে ছবি এঁকেছিল, টা দেখিয়েছিল তার বন্ধুদের, সে বন্ধু আবার নিজের মত করে আবার আকার চেষ্টা করলো, সে আবার দেখালও আরেকজনকে, এভাবে করে এক জন থেকে আরেক জনে, এক দল থেকে আরেক দলে, এক বংশ থেকে আরেক বংশে, এক যুগ থেকে অন্য আরেক যুগে তাঁরাদের ছবি প্রচলিত হয়ে আসছে। আর এখন এইসব ছবি আধুনিক আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার বইয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
এই ছবিগুলো যারা এঁকেছিলও, তারা হয়তো মিলিয়ে গিয়েছেন সভ্যতা ও সময়ের অতল তলে, কিন্তু তাদের সেই সৃষ্টি নিয়ে এখনও গবেষণার শেষ হয় না। এই ছবিগুলো যে কত প্রাচীন ছিল তা আদিম গুহামানবদের গুহাগুলোর দিকে তাকালেই লক্ষ্য করা যায়। তাদের গুহাগুলোতেও এমন তারার ছবি গুলো পাওয়ার প্রমান আছে।
প্রতিটি সভ্যতার মানুষেরাই তারাদের নিয়ে এই আলোচনা ধরে রেখেছে। তারা তাঁরাদের সেই কাল্পনিক ছবিকে কেন্দ্র করে তৈরি করেছে নানান ধরনের গল্প-কাহিনী, আবার কখনোবা তাদের মাঝে প্রচলিত কোনো গল্প-কাহিনীকে কেন্দ্র করেই আকাশের তাঁরাদের নিয়ে ছবি কল্পনা করেছে। সভ্যতাগুলি যখন আরো পরিপক্ব হয়েছে তখন তারা ধীরে ধীরে ঝুঁকেছে জ্যোতিষশাস্ত্রের দিকে, আর এই জ্যোতিষশাস্ত্র থেকেই জন্ম হয়েছে আমাদের আজকের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের। তারাদের নিয়ে আরেকটি মজার ব্যাপার হল মানুষের রাশিচক্র। আমরা জানি পৃথিবীর মত অন্য গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, কিন্তু আগের মানুষরা যারা রাশিচক্র আবিষ্কার করেছেন তারা হয়ত জানতেন পৃথিবীকে সূর্য একটা নির্দিষ্ট বৃত্তে প্রদক্ষিণ করে, আপাতপক্ষে কিন্তু তাই, আমরা কিন্তু পৃথিবীর গতি বুঝতে পারি না, আমরাও বুঝি সূর্য প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট পথে, যারা এই রাশিচক্র আবিষ্কার করেছেন তারা সূর্যের এই ভ্রমণের বৃত্তপথকে ১২টি ভাগে ভাগ করেছেন। অনেকে আবার আরও কিছু কম বা বেশি করেছেন।
কিন্তু ১২ টির কিন্তু সবচেয়ে বেশি জাতি ছিল, এই বিষয়টা অনেকটাই অলৌকিক, কারন প্রাচীন কালে যে জাতিগুলো রাশিচক্র বের করেছে, তাদের মধ্যে গ্রিস , মিশর ও ভারতবর্ষের মানুষেরাই ছিল সেরা, তারা সবাই কিন্তু রাশিচক্রকে ১২ ভাগই করেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কোন যোগাযোগই ছিল না, কিন্তু ভাবনার এতো নিখুঁত মিল, সত্যি অবাক করার মত। সূর্যপথের এই বারটি ভাগের বারটি নাম রয়েছে এবং এই বারটি অংশেই বারটি ছবি কল্পনা করা হয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে শুধুমাত্র চীন ছাড়া, গ্রীস, মিসর, ক্যালডিয়া, আরব, ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশে এ বারটি অংশ এবং এদের নাম হুবহু একই ছিলও এবং আছে, তাছাড়া তাদের ছবিও প্রায় একরূপ। সূর্যপথের বারভাগের প্রতিটি ভাগকে রাশি বলে আর তাই সূর্যের ভ্রমণ পথকে রাশি চক্রও বলা হয়.
রাশিচক্রের বারটি রাশি:
বাংলা নাম >>> আরবী নাম >>> পাশ্চাত্ত্য নাম >>> রাশির ছবি
১। মেষ >>>>> হামাল >>>>>এরিস >>>>>>> ভেড়া।
২। বৃষ >>>>> থৌর >>>>>> টরাস >>>>>>> বলদ।
৩। মিথুন >> > জৌরা >>>>> জেমিনী >>>>>> নর-নারী।
৪। কর্কট >>>> সরতন >>>> ক্যান্সার >>>>> কাঁকড়া।
৫। সিংহ >>>> আসাদ >>>>> লিও >>>>>> সিংহ।
৬। কন্যা >>>> আজরা >>>>>ভার্জো >>>>>> কুমারী মেয়ে।
৭। তুলা >>>> মীজান >>>>> লিব্রা >>>>>>> নিক্তি।
৮। বৃশ্চিক >>> আকরাব >>>> স্করপিও >>>>>> কাঁকড়া বিছা।
৯। ধনু >>>>> কৌস >>>>> স্যাজিটারিয়াস >>> ধনুক।
১০। মকর>>>> জিদ্দী >>>>> ক্যাপ্রিকর্নস >>>>> ছাগল।
১১। কুম্ভ >>>> দলওয়া >>>>একোয়ারিয়াস >>>> কলস।
১২। মীন >>>> হূত >>>>>> পিসেস >>>>>>>> মাছ।
প্রাচীনকালে এই তারার-হিসাব অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কারন এই তারাগুলো দিয়ে তারা মাস-ঋতু-বছর হিসাব করতো। প্রতি মাসেই সূর্য এক রাশি থেকে আরেক রাশিতে সরে যায়, ফলে সূর্য কোন রাশিতে তা দেখে সহজেই বুঝা যায় তখন কোন মাস চলছে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সূর্য কোন রাশিতে অবস্থান করছে তা বুঝবো কি করে!! দিনের বেলতও সূর্যের আলোতে কোনো তাঁরাই দেখা যাবে না, তাহলে উপায়? উপায় অবশ্যই আছে, মোটামুটি সকলেই আমরা জানি পূর্ণিমার রাতে চাঁদ থাকে টিক সূর্যের উল্টো দিকে। ফলে তখন চাঁদ যে রাশিতে থাকবে সূর্য থাকবে তার পরের ঠিক সপ্তম রাশিতে। ধরা যাক কোনো পূর্ণিমা রাতে আমরা দেখতে পেলাম চাঁদ রয়েছে মকর রাশিতে তাহলে সেই সময় সূর্য থাকবে কর্কট রাশিতে। কিন্তু এই পদ্ধতির একটি সমস্যা হচ্ছে, এর জন্য আপনাকে পুরো এক মাস অপেক্ষা করতে হবে। তবে আরো একটি সহজ উপায়ে আপনি প্রতি দিনই জেনে নিতে পারেন সূর্য কোন রাশিতে আছে।
মহাকাশের প্রতিটি জ্যোতিষ্কই ২৪ ঘণ্টায় একবার আমাদের পৃথিবীর মধ্যে আসে, যেমন সূর্য আসে দুপুরবেলায়, ঠিক তেমনি সূর্যের উল্টো দিকে যে তারাটি থাকে সেটা আসবে ঠিক মধ্যরাতে, এভাবেই প্রাচীনকালের মানুষেরা দিনকালের হিসাব রাখতো।
এই তারাগুলো নিয়ে এমন ক্ষুদ্র আলোচনা কিছুই না, আমি যতোটুকু জানি ততটুকুই বলেছি, আশা করি সবার ভালো লেগেছে।
Posted on জানুয়ারি 27, 2012, in Uncategorized. Bookmark the permalink. 2 টি মন্তব্য.

ভালা হৈসে
লাইক
dhonnobad